ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  বৃহস্পতিবার ● ১৯ মে ২০২২ ● ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
ই-পেপার  বৃহস্পতিবার ● ১৯ মে ২০২২
শিরোনাম: খালিয়াজুরীতে বজ্রপাতে দু'জনের মৃত্যু       ধান বোঝাই ট্রাক উল্টে ৩ শ্রমিক নিহত       চেয়ারম্যানের ছেলেকে কুপিয়ে হত্যার পর যুবকের আত্মহত্যা       বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে চায় যুক্তরাষ্ট্র: পিটার হাস       বিশ্বকাপের কাজে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে আগ্রহী কাতার       সিলেটে বন্যার পানি বাড়ছে, আতঙ্কে বানভাসি মানুষ        হজযাত্রী নিবন্ধনের সময় বেড়ে ২২ মে পর্যন্ত      
দূর শিক্ষনই শিক্ষার্থীদের ভরসা
নূরুজ্জামান মামুন
Published : Sunday, 23 January, 2022 at 8:30 PM

করোনাভাইরাসের সংক্রমন বাড়ায় ফের দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। সংক্রমন নিয়ন্ত্রণে না আসলে খুলে দেওয়া হবে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীরা ঘরবন্দি হলেও বন্ধ হয়ে যায়নি তাদের লেখাপড়া। এ সময়ে শিক্ষকদের অনলাইনে/ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে ক্লাস নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। ভার্চুয়াল ক্লাসে যুক্ত হওয়ার জন্য দেশের প্রায় পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী মোবাইল ফোন নির্ভর হয়ে পরেছে। তাদের প্রতিদিন ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভার্চুয়াল ক্লাসে যুক্ত হওয়ার জন্য ইন্টারনেট  ডেটা কিনতে হচ্ছে। বিশ্বিবিদ্যালয়ের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস যুক্ত করার জন্য স্মার্টফোন কিনতে এরই মধ্যে ১০ হাজার টাকা করে শিক্ষাঋণ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জরি কমিশন (ইউজিসি)। এভাবে দেশে মোবাইল ফোন ব্যাবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে বলে অনেক অভিভাবক দাবি করেছেন। অনলাইন ক্লাসের পাশাপাশি সংসদ টিভির মাধ্যমেও প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের পাঠাদান কার্যক্রম চলছে।  

দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর সারা দেশে কঠোর বিধিনিষেধ জারি হলে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় ধাপে ধাপে ছুটি বাড়ানো হয়। সংক্রমণ কমে এলে ৫৪৩ দিন পর গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয় সরকার। তাতে দীর্ঘদিন পর শ্রেণিকক্ষে ফেরার সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধকালীন স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে ভার্চুয়াল পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে সম্প্রতি করোনাভাইরাস সংক্রমনের ঊর্ধ্বগতির কারণে গত শুক্রবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে শ্রেণি কক্ষে সরাসরি পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। তবে শনিবার মাউশির মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্বে) শাহেদুল খবির চৌধুরীর সই করা ১১ দফা নির্দেশনা জারি করেছে মাউশি। তাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধকালীন কর্তৃপক্ষকে অনলাইন/ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে শিখন-শেখানা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

বাংলাদেশে ইন্টারনেট প্রসারের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারী, যার মধ্যে শিশুরাও রয়েছে। বিটিআরসির ১০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের প্রায় ৩.৫ শতাংশ নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করে। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দেশের প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী ইন্টারনেটে যুক্ত হয়েছে।  

রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বনশ্রী শাখার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক শাহিন জামান বলেন, গত বছর করোনার মধ্যে স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষকরা ভার্চুয়াল ক্লাস নিয়েছে। আমার স্মার্ট ফোন না থাকায় মেয়ে ভার্চুয়াল ক্লাসে যুক্ত হতে পারেনি। আমি নিজেই পড়িয়েছি। এবার পঞ্চম শ্রেণিতে উঠায় সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। মেয়ে ভার্চুয়াল ক্লাসে অংশ না নিলে অনেক কিছু শিখতে পারবে না। বাধ্য হয়ে ২৩ হাজার টাকা দিয়ে স্মার্ট ফোন কিনেছি। তিনি আরো বলেন, ফোন কেনার পর এখন প্রতিদিন ইন্টারনে ডেটা কিনে দিতে হচ্ছে। মেয়ে ক্লাস শেষে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আরো অনেক কিছু শিখছে। পড়াশুনা ছাড়া মেয়েকে মোবাইল ব্যবহার করতে দেই না। তবে অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, ভার্চুয়াল ক্লাস করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে গেইমসহ নানা বিষয়ে আসক্ত হয়ে পরছে।  
  
কোভিড -১৯-এর কারণে স্কুল বন্ধের সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত ‘আমার বাড়ি আমার স্কুল’ নামে সংসদ টেলিভিশনে ক্লাস পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষকরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অনলাইনের মাধ্যমে পাঠদান করছেন। তবে তা পর্যপ্ত নয় বলে ইউনিসেফের সঙ্গে সাম্প্রতিক এক ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় অংশ নিয়েছে বাংলাদেশের আটটি বিভাগের প্রতিনিধিত্বকারী শিক্ষার্থীরা।  শিক্ষার্থীরা বলে, দূরশিক্ষণ যদিও তাদেরকে পাঠ্যক্রমের সংস্পর্শে থাকতে সহায়তা করে, তবে এক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কোভিড-১৯ এর কারনে স্কুল বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি ২০ লক্ষ শিশু ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। স্কুল বন্ধ থাকায়  দূরশিক্ষণের উপর নির্ভর করা ছাড়া শিক্ষার্থীদের উপায় নেই। তবে, শিক্ষার্থীদের অনেকেরই ডিজিটাল প্রযুক্তির সুবিধা নেই। অনেক শিক্ষার্থী ভার্চুয়াল ক্লাসকে তাদের প্রত্যাশা এবং শেখার চাহিদার তুলনায় কম বলে  দাবি করেন। 

১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নিশাত তাহিয়া প্রমি জানায়, স্কুল বন্ধ থাকয় স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে ভার্চুয়াল ক্লাসে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। তবে শ্রেণিকক্ষের তুলনায় অনলাইন শিক্ষায় প্রয়োজনীয় একাডেমিক দিকনির্দেশনা, মূল্যায়ন এবং মতামত আদান প্রদানের অভাব রয়েছে। দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ, ডেটা শেষ হয়ে যাওয়া এবং বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারনে আমাদের ক্লাস প্রায়শই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ফোকাস গ্রুপে অংশগ্রহণকারী সবাই একমত পোষন করে বলেন, গ্রামীণ অঞ্চল এবং আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই টেলিভিশন, রেডিও, ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনের মাধ্যমে দূরশিক্ষণের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পারছে না। কারণ, এসব ডিভাইস ব্যবহার করার সুযোগ অনেকেরই নেই। দূরশিক্ষণকে সবার জন্য উন্মুক্ত করতে ইন্টারনেট ডেটার শুল্ক কমিয়ে শিক্ষণ প্ল্যাটফর্মগুলোর বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মহামারির শুরু থেকেই টেলিভিশন, রেডিও, ইন্টারনেট এবং মোবাইল ফোনসহ একাধিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে শিক্ষার সকল ধারা যেমন, আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক, ধর্মীয় ও কারিগরি শিক্ষাকে একত্রিত করে দূরশিক্ষণের কৌশল প্রণয়ন এবং এর বাস্তবায়নে ইউনিসেফ বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করেছে।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ইকবাল হোসেন বলেন, প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে এবং দূরশিক্ষণে আরো ন্যায়সঙ্গত সুযোগ তৈরি করতে ইউনিসেফ স্মার্ট ফোনের পরিবর্তে বেসিক মোবাইল ফোন এবং টেক্সট বার্তা ব্যবহার করে শেখার সুবিধা দিচ্ছে। তবে, কিছু সংখ্যক শিশুর বেসিক মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় আমরা প্রায়শই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হই। এসব শিশুর দোরগোড়ায় একটি মুদ্রিত শিক্ষণ প্যাকেজ পৌঁছে দিতে ইউনিসেফ বাংলাদেশ সরকারের সাথে কাজ করছে। এর উদ্দেশ্য হলো কোনো শিশু যেন পিছনে পড়ে না থাকে।

মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক আমান উল্লাহ আজকালের খবরকে বলেন, স্কুল বন্ধ থাকলেও আমাদের পাঠদান বন্ধ হয়নি। শ্রেণি কক্ষের রুটিনের মতো আমরা নিয়মিত অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষা নিচ্ছি। এতে প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা মোবাইলে অন্য বিষয়ে  যাতে আসক্তি না হয় এ বিষয়ে অভিভাবকদের নজর রাখতে বলা হয়েছে। 

দুর্গম জেলা সুনামগঞ্জের ষোলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তামান্না তমন বলেন, সংসদ টিভির মাধ্যমে প্রতিদিন পাঠদান চলছে। পাশাপাশি আমরা মোবাইল ও ইন্টারন্টে ব্যবহার করে ক্লাস নিচ্ছি। যাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই সেসব শিক্ষার্থী আমাদের ক্লাসে যুক্ত হতে পারছে। তবে এতে করে দরিদ্র পরিবারের খরচ বেড়ে গেছে।   

চলমান মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে বন্ধ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন ক্লাসসহ পরীক্ষাও নিচ্ছে। তবে স্মার্টফোন ও ল্যাপটপসহ প্রয়োজনীয় ডিভাইস না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হতে পারছেন না। অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে তাদেরকে স্মার্টফোন কেনার জন্য গত বছর ১০ হাজার টাকা করে শিক্ষাঋণ দিয়েছে ইউজিসি। 

এ প্রসঙ্গে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, সব শিক্ষার্থীকে অনলাইন ক্লাসে যুক্ত করতে শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন কিনতে ১০ হাজার টাকা করে শিক্ষাঋণ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালগুলো তালিকা অনুযায়ী অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের এ ঋণ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্বিবিদ্যালয়ের অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে অংশ নেওয়াসহ প্রয়োজনীয় তথ্য ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করতে পারছে। শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাবর্ষ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এই ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবেন।
 
জানতে চাইলে মাউশির মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশেন উইং এর পরিচালক প্রফেসর মো. আমির হোসেন আজকালের খবরকে বলেন, আমরা ব্লেন্ডিং পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্বান্ত নিয়েছি। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে পাঠদান ক্ষতিগ্রস্থ হবে না। যেসব শিক্ষার্থী টিভি বা মোবাইলের মাধ্যমে ভার্চুয়াল পাঠদানে যুক্ত হতে পারছে না তাদের যুক্ত করা হবে। কোনো শিক্ষার্থীই বৈষম্যের শিকার হবে না।  

আজকালের খবর/আরইউ






সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.net, www.ajkalerkhobor.com